গল্পের নাম: ”অন্ধকারের মেহেররা” ♣ | টেকএলার্মবিডি।সবচেয়ে বড় বাংলা টিউটোরিয়াল এবং ব্লগ
Profile
মুহাম্মাদ মিনহাজ

মোট এলার্ম : 28 টি

মুহাম্মাদ মিনহাজ

আমার এলার্ম পাতা »

» আমার ওয়েবসাইট :

» আমার ফেসবুক : www.fb.mai.minhaz

» আমার টুইটার পাতা :


স্পন্সরড এলার্ম



গল্পের নাম: ”অন্ধকারের মেহেররা” ♣
FavoriteLoadingপ্রিয় যুক্ত করুন
Share Button

নিউ ইস্কাটনের এক পত্রিকা অফিসে যাবে বলে বিজয়নগর পানির টাঙ্কির কাছে দাড়িয়ে আছে আফতাব সাহেব। রিক্সার জন্য দাড়িয়ে আছে সে। হরতাল ডেকেছে বিরোধীদল। এই রিক্সা—এই রিক্সা—-যাবে–কেউ হাত নেড়ে, কেউ মাথা নেড়ে, কেউ কোন জবাব না দিয়ে শুঁড় শুঁড় করে চলে যাচ্ছে। হরতালে প্রচুর আয় হয় বলে রিকশাওয়ালাদের ভাড়া টানার তেমন গরজ নেই। বাস নেই বলে রিক্সাতে বাড়তি খরচা গুনতে হবে ভাবছে আফতাব সাহেব। উপায় কি যেতে যখন হবেই। তারপরও এ সব ভাবতে ভাবতে আফতাব সাহেব এক সময় দেখতে পায় তার পাশে এসে হাত বাড়িয়ে দাড়িয়ে আছে জীর্ণ শীর্ণ অর্ধ উলঙ্গ এক পাগল। হাত বাড়িয়ে কেবল দাড়িয়েই আছে কিছুই বলছে না সে। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে শুধু। কিছু বলতে চায় কি না জানতে চেয়ে আবিষ্কার হয় পাগলটা আর কেউ নয় খারুয়াজংলা উত্তর পাড়ার ছলিমের ছেলে মেহের।
মেহের ঢাকায় এসেছে প্রায় দশ বছর হবে। মেহেরের বাবা ছলিম মারা যাবার কিছুদিন পরই বিধবা মা মজিরন এবং দুই বোন ছালেহা আর সালেকাকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমায় মেহের পরিবার। ওর এক মামা ঢাকায় ঠেলাগাড়ি চালায়। ঢাকায় অনেক আয় হয় বলে শুনেছে মেহের। মেহেরের বয়স তখন পাঁচ এখন পনের। এতো অল্প বয়সে আয় করে চার মুখের সংসার কি চালানো সম্ভব এতোসব ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়ে মেহেরের মা মজিরন। ভাইয়ের সাহায্যে ঠাঁই হয় আগারগাও বস্তিতে। ঢাকায় যাবার পর প্রথমদিকে ভাইয়ের সাহায্য-সহযোগিতা পেলেও তা বেশিদূর গড়ায়নি। মাথা গোজার জায়গা হলেও খাবার যোগার করতে বেশ হিমশিম খেতে হয় তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে বিধবা মজিরনের। একদিন বাধ্য হয়েই শিশু মেহেরকে যেতে হয় রাজমিস্ত্রির যোগানদার হিসাবে কাজে। মেহের মজিরনের একমাত্র আদরের ছেলে তারপর এইটুকু বয়সে ছেলেকে কাজে দেবে একথা ভেবে অস্থির হয়ে যায়। মেহের যেদিন প্রথম কাজে যায়, সেদিন দিনভর কেঁদেছিলো মজিরন। ছেলে না ফেরা পর্যন্ত দানা পানি পর্যন্ত মুখে দেয়নি সে। এভাবেই প্রথম ক’দিন কেটেছে মজিরনের।
ছেলের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির কথা ভেবে মজিরন এবার ভাবে নিজে কিছু করা যায় কি না অথবা ছালেহা আর সালেকাকেও দিয়ে কিছু করানো যায় কি না ? এরই মধ্যে শ্যামলী’র এক বাসায় ঝিয়ের কাজ জুটে যায় মজিরনের। রোজ সকালে গিয়ে সন্ধ্যার সময় ফিরবে বেতন পাঁচশ’ টাকা। কাপড় চোপর কিছুই দেবে না। মজিরনের কাজ জুটে যাবার পর ঝি’য়ের কাজ জুটে যায় সালেহারও। ছোট্ট মেহের, মজিরন ও ছালেহার আয় মিলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চলছিলো মজিরনের সংসার। ছালেহা যে বাসায় কাজ নেয় সে বাসার সাহেব গায়ে গতরে ডাগর ছালেহার উপর খারাপ নজর দেয়। ম্যাডাম যখন বাসায় থাকে না, বাচ্চা নিয়ে স্কুলে অথবা একাকী মার্কেটে যায় তখনি সুযোগ পেয়ে যায় সাহেব। বড় লোকদের অসভ্য রুচিজ্ঞানের কালচার যাকে বলে। বিকৃত চিন্তার সহজলভ্য এক দারিদ্রের পীড়ন। গল্পে এই ধরনের উপস্থাপনাকে ভিন্নচোখে না দেখে কোন কোন পরিবারে ব্যক্তিতে যে এমনটি ঘটনা ঘটতেই পারে, সেটা মেনে নেয়ার অনুরোধ রইলো পাঠকের কাছে।
অভাবী ছালেহাকে আর বেশীদিন বাসাবাড়িতে কাজ করতে দ্যায়নি হতদরিদ্র মজিরনের পরিবার। ইজ্জত গরীব ধনীতে পার্থক্য করে না কেবল ইজ্জত রক্ষার জ্ঞান থাকতে হয়, হতে হয় আত্মসচেতন। এর কিছু দিনের মধ্যে বয়স বিবেচনায় না করে গায়ে গতরে সাবালক ভেবে ছালেহাকে বিয়ে দেয়া হয় পরিচিত এক ভ্যানওলার সাথে। ভ্যানওয়ালার প্রথম স্ত্রী মেনে না নেয়ায় মামলা ঠুকে দেয়। শেষ পর্যন্ত সেখানে আার ছালেহার সংসার টেকেনি। মাঝখানে এক সন্তানের ঝামেলা নিয়ে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে ছালেহাকে আসতে হয় বৃদ্ধা মায়ের সংসারের বোঝা হয়ে। মজিরনের অ্যাজমা ছিলো। বয়স বাড়ায় এবং ওষুধের অভাবে মাঝে মাঝে এতোটাই বেড়ে যায় যে হাসপাতালে না নিয়ে উপায় থাকেনা। সেটাও আবার সরকারি হাসপাতালে। কারণ সেবার মান যাই হোক বিনামূল্যে চিকিৎসাটা পাওয়া যায়। ওইদিন হঠাৎ করেই বৃদ্ধা মজিরনের শ্বাসকষ্ঠ বেড়ে যায়। ছালেহা আর সালেকা মিলে মাকে নিয়ে মেডিকেলে যাচ্ছিলো সিএনজিতে। কলেজগেটে পৌঁছানো মাত্রই বোমারুদের শিকার হয় অসুস্থ মজিরনের সিএনজিটি। মাকে নিয়ে আর হাসপাতালে যাওয়া হয় না তাদের। তিনজনই পেট্রোল বোমায় ঝলসে মারা যায় সেখানেই। সিএনজি’র চালক রফিকুলকে মরণাপন্ন অবস্থায় মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন হরতাল ছিলো।
হরতাল মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। বর্তমানে হরতাল অবরোধের নামে যা ঘটছে এটাকে আর রাজনৈতিক কর্মসূচি বলার সুযোগ নেই। হরতাল অবরোধকে রীতিমতো সন্ত্রাস বলছে সুশীল সমাজ। রেলের ফিস প্লেট তুলে উপড়ে ফেলা হচ্ছে রেললাইন, সড়ক কেটে-সড়কের গাছ কেটে, ব্রিজের পাটাতন উপড়ে আগুন দিয়ে করা হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। এমনকি পেট্রোল বোমা মেরে হত্যা করা হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। হরতাল মানে দাঁড়িয়েছে নির্মম বর্বরতার এক জামাতি উল্লাস। আর যাই হোক হরতালের বর্তমান অবস্থাকে কোন গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলা যাবে না। মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আগুনে পোড়া রোগীদের থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝেতে। স্বজন-প্রিয়জনের আহাজারিতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না সাধারণ মানুষ দর্শনার্থীরা। অগ্নিদগ্ধ পিতাকে চিনতে পারছে না তার অবুঝ সন্তান। প্রতিদিনের এমন চিত্র বলে দেয় এটা হরতাল নয় ভয়তাল। দিনকে দিন রাজনৈতিক সহিংসতায় জীবন যাচ্ছে শত শত শিশু নারী পুরুষের। আতংকের জনপদে পরিণত হচ্ছে দেশ। অবরুদ্ধ গোটা বাংলাদেশকে মনে হচ্ছে কারাগার।
এতকিছুর মধ্যে থেমে নেই জীবন জীবিকার জন্য প্রতিদিনের পথচলা। হরতাল অবরোধকে যখন সবাই দেখছে আতংকের চোখে। দেশকে নিয়ে আরও একটু বেশি যারা ভাবেন তারাতো হতাশ গণতন্ত্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে। এরইমধ্যে হরতাল অবরোধের খবরে খুশি হতে দেখা যায় মেহেরকে। কার ক্ষতি হলো ক’জন মারা গেলো দেশকে নিয়ে এতকিছু ভাববার সময় নেই তার। অন্ধকার জগতের মেহের জানে হরতাল হলে তার ইনকাম হবে। ভালভাবে চলবে-ভাল খাবে।
মা মজিরন অসুস্থ থাকে মাঝেমধ্যেই। বছর পাঁচেক হয় বয়সের ভারে মজিরন আর কাজে যায় না। খাওয়া পড়ার চিন্তা ছিলো না যে সংসারে। সেই সংসারে এখন খানিকটা অভাবের প্রতিধ্বনি। মেহেরের দুবোন ছালেহা ও সালেকা ঠোঙা বানিয়ে আর কতোই বা আয় করে। গেল বছর ছালেহার বিয়েতে খরচা হয়েছিলো অনেক টাকা। এ দিকে মায়ের আদরে-এবং প্রতিবেশের অবহেলায় মেহের কাজ না করতে করতে এবং ওই বস্তির এশারতের সাথে মিশে নেশার জগতে তরী ভেড়ায়। এশারতের মতো বকে যায় মেহের।
এশারতের কাছ থেকে খবর পায় মেহের যে আজিমপুর এতিমখানায় এক বড় ভাই গোপন মিটিংয়ে বসেছে। সেদিন ছিলো রোববার। পরদিন সোমবার থেকে বিরোধীদলের তৃতীয়দফা হরতাল শুরু হবে। বড় ভাইয়ের নির্দেশে বোমা মারতে হবে মেহেরকে কলেজগেইট এলাকায়। বোমা মারলে বোমা প্রতি এক’শ টাকা আর পেট্রোল বোমা মারলে দু’শ টাকা। এ দিন মেহের ভাবে টাকার খুব প্রয়োজন তাই সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে এবার পেট্রোল বোমা মারবে। মেহের বেশ উৎসুক-উৎকণ্ঠা নিয়ে বড় ভাইয়ের নির্দেশে কলেজগেইটে একটি সিএনজিতে পেট্রোল বোমা ছোঁড়ে। দৌড়ে পালাতে যেতে যেতে শুনতে পায় তার ওই বোমায় বৃদ্ধা মা এবং তার দুই মেয়ে আগুনে পুড়ে মারা গেছে।্ মারাত্মক আহত সিএনজি ড্রাইভারকে নেয়া হয়েছে মেডিকেলে। ওটাই ছিলো মেহেরের কাছে থাকা শেষ বোমা। বোমা মারতে পারদর্শী হওয়ায় বেশ নাম ডাক ছড়িয়েছে মেহেরের ইতোমধ্যেই।
মেহের বড় ভাই একজনের কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে ফিরছে। কারও মৃত্যুর খবর তখনো এতোটুকু আহত কিম্বা বিচলিত করেনি মেহেরকে। খানিকটা উৎফুল্ল মেহের ফিরতে ফিরতে ভাবছে আজ সে বড়দেখে একটা ইলিশ মাছ কিনবে। অসুস্থ মা বোনদের নিয়ে উদর পুরিয়ে খাবে। বাজারের দিকে যাচ্ছে মেহের। মেহেরকে চিনতে পারে পুলিশ-পুলিশের ধাওযা খেয়ে মেহের ঢুকে পরে এক বাসার মধ্যে। সেখানেই টিভি স্কলে লেখা উঠছে কলেজগেইটে পেট্রোল বোমায় ঝলসে ঘটনাস্থলেই মারা গেছে এক বৃদ্ধা ও তার দুই মেয়ে। মেহের নিশ্চিত হয় তার ছোড়া বোমাতেই মৃত্যু হয়েছে এই তিন জনের। পুলিশ থেকে নিরাপদ হবার কিছুক্ষণের মধ্যে সটকে পরে মেহের। যদিও মেহেররা জানে পুলিশ তাদেরকে আটকে রাখতে পারবে না। বড় ভাইরা ছাড়িয়ে আনবে। অগত্যা জেল হয় যদি তবে তদ্বির করে জামিনে নিয়ে আসবে। এ যাত্রা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেহের আবার যেতে চায় বাজারের দিকে। মেহের খেয়াল করে দেখে তার পকেটে টাকাটা নেই। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় টাকাটা হয়তো পরে গেছে অথবা হাড়িয়ে ফেলেছে মেহের। মেহেরের আর ইলিশ কেনা হয় না। বিফল বিষণ্ণ মেহের দিনভর খাটুনিতে অবসন্ন হয়ে বস্তিতে ফিরতে থাকে। সে ভাবে বাসায় ফিরে খাবে কি। আবার ভাবে মা বোনেরা না খেলেও তার খাবার ঠিকই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সম্বিত ফিরে পায় মেহের, ভাবে এভাবে আর কতদিন ? বোমা মারা কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ তাই কম ধকল যায়নি সারাটা দিন মেহেরের। তারপর পুলিশের ধাওয়া খেয়েছে। মেহের ভাবতে থাকে তার নিকট এবং সুদূর অগোছালো অতীতগুলো কিভাবে কেটেছে। কিভাবে কাটবে সামনের দিনগুলো। সে ততোক্ষণে বস্তির কাছাকাছি এসে যায়। মেহের তাদের বস্তির গলির মধ্যে অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পায়। ভিড় ঠেলে এগুতে থাকে মেহের। পিছন থেকে পাশের ঝুপড়ির রহিমা খালা চিৎকার করে ডাকে —বলে মেহেররে তুই এতক্ষণে আসলিরি বাপ—–তোর মা বোনরা নেই—–তোর কেউ নেই। মেহের গগণ ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারায়। সেই থেকে বাকহীন বোমা মেহের পথে পথে——-।

 

(507)

Share Button
  

FavoriteLoadingপ্রিয় যুক্ত করুন

এলার্ম বিভাগঃ সাহিত্য/কবিতা

এলার্ম ট্যাগ সমূহঃ > >

Ads by Techalarm tAds

এলার্মেন্ট করুন

You must be Logged in to post comment.

© টেকএলার্মবিডি।সবচেয়ে বড় বাংলা টিউটোরিয়াল এবং ব্লগ | সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

জেগে উঠো প্রযুক্তি ডাকছে হাতছানি দিয়ে!!!


Facebook Icon